অসম্ভবকে সম্ভব করার লড়াই

লিওনেল মেসির জায়গা কে নেবেন? ফুটবল বিশ্বে প্রশ্নটা শুনতে যতটা স্বাভাবিক, উত্তর খুঁজতে গেলে ততটাই কঠিন। কারণ, একটা দলের অধিনায়ক, সেরা খেলোয়াড় কিংবা প্রধান গোলদাতার জায়গা অন্য কেউ নিতে পারেন। কিন্তু মেসির মতো একজন ফুটবলারের জায়গা নেওয়া কি আদৌ সম্ভব?
আর্জেন্টিনার ফুটবলে এখন সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার সময়। ৩৯ বছর বয়সী মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর পর আলবিসেলেস্তেদের সামনে নতুন অধ্যায় শুরুর চ্যালেঞ্জ। তাঁর বিদায় মানে শুধু একজন কিংবদন্তি ফুটবলারের অনুপস্থিতি নয়; একই সঙ্গে দলের সৃজনশীলতা, আক্রমণ সাজানোর ক্ষমতা এবং চাপের মুহূর্তে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার মতো একজন খেলোয়াড়কে হারানো।
এই শূন্যতা পূরণের আলোচনায় স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসছে কয়েকটি নাম। আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনো—তাঁদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এখন নিকো পাজ। বিশেষ করে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বিরতিতে পাজের পারফরম্যান্স তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
প্রশ্ন হলো, মেসির ১০ নম্বর জার্সি কি পাজের কাঁধে উঠতে যাচ্ছে? আর উঠলেও, সেই জার্সির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রত্যাশার ভার সামলানোর মতো প্রস্তুতি কি তাঁর আছে?
মেসির বিদায়, পাজের সামনে নতুন দরজা
মেসির মতো খেলোয়াড়ের উত্তরসূরি খোঁজার সমস্যা হলো, এখানে তুলনার মানদণ্ডটাই অস্বাভাবিক উঁচু। গোল, অ্যাসিস্ট কিংবা ম্যাচে প্রভাব—কোনো একটি পরিসংখ্যান দিয়ে মেসিকে ব্যাখ্যা করা যায় না। তিনি একই সঙ্গে আক্রমণের নির্মাতা, গোলদাতা, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণকারী এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে দেওয়ার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
তাই মেসির জায়গায় কে খেলবেন, প্রশ্নটা শুধু একজন ফুটবলারের নাম খুঁজে বের করার বিষয় নয়। আর্জেন্টিনাকে বুঝতে হবে, মেসির চলে যাওয়ার পর দলের খেলার ধরন কীভাবে বদলাবে এবং কোন খেলোয়াড়কে কেন্দ্র করে নতুন আক্রমণভাগ গড়ে তোলা যায়।
নিকো পাজের নামটি এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আর্জেন্টিনার হয়ে এখন পর্যন্ত ১৪টি ম্যাচ খেলেছেন পাজ। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর অভিজ্ঞতা মেসির সঙ্গে তুলনীয় নয়, অর্জনের ব্যবধানও আকাশ-পাতাল। কিন্তু খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর বৈশিষ্ট্যগুলো আর্জেন্টিনাকে নতুন সম্ভাবনার কথা ভাবাচ্ছে। তিনি বাঁ পায়ের সৃজনশীল মিডফিল্ডার, আক্রমণের মাঝের জায়গাগুলোতে বল নিয়ে খেলতে পারেন, সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারেন এবং প্রয়োজন হলে নিজেও গোলের জন্য এগিয়ে যেতে পারেন।
এর সঙ্গে আছে তাঁর শারীরিক সক্ষমতা। প্রায় ৬ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার পাজ বল পায়ে যেমন স্বচ্ছন্দ, তেমনি শারীরিক উপস্থিতির মাধ্যমেও দলের খেলায় বাড়তি মাত্রা যোগ করতে পারেন।
সব মিলিয়ে, তাঁকে শুধু মেসির বিকল্প হিসেবে দেখার চেয়ে আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ আক্রমণভাগের গুরুত্বপূর্ণ একজন খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করাই বেশি যুক্তিযুক্ত।
তিন ম্যাচে তিন গোল, বিদায়ী মেসির কাছ থেকেও পেলেন উপহার
নিকো পাজের পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি এখন তাঁর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক বিরতিতে আর্জেন্টিনার তিনটি প্রীতি ম্যাচেই গোল করেছেন তিনি। এর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ গোলটি এসেছে মেসির বিদায়ী ম্যাচে।
এস্তাদিও মনুমেনতালে বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের জয়ের ম্যাচটি ছিল মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের উপলক্ষ। সেই ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন পাজ। ডান প্রান্তে মেসির সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়া তৈরি হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। এরপর বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে দূরের কোণে বল পাঠিয়ে নিজের গোলটি করেন তিনি।
গোলটির সৌন্দর্য যেমন ছিল, তেমনি ছিল এর প্রতীকী তাৎপর্য। আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির শেষ ম্যাচে তাঁর অ্যাসিস্ট থেকেই গোল পেলেন সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের একজন। যেন এক প্রজন্মের কাছ থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার একটি দৃশ্য।
অবশ্য ফুটবলে এমন মুহূর্তকে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা যায় না। একটি সুন্দর গোল কিংবা কয়েকটি ভালো ম্যাচ কাউকে মেসির সমতুল্য করে তোলে না। তবে পাজের জন্য এই পারফরম্যান্স গুরুত্বপূর্ণ—কারণ, তিনি শুধু সম্ভাবনার কথা শোনাননি; মাঠে নেমে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণও দিয়েছেন।
তিন ম্যাচে তিন গোল তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনির সামনেও নতুন কিছু ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।
কোমোর সাফল্যে পাজের বড় ভূমিকা
আন্তর্জাতিক ফুটবলে আলোচনায় আসার আগেই ক্লাব ফুটবলে নিজের সামর্থ্যের পরিচয় দিয়েছেন পাজ। ইতালির কোমোর হয়ে তাঁর পারফরম্যান্স ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গত মৌসুমে ক্লাবটির ঐতিহাসিক চ্যাম্পিয়নস লিগে জায়গা করে নেওয়ার অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এই আর্জেন্টাইন।
মৌসুমে ১২টি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে গোল করিয়েছেন সাতবার। একজন সৃজনশীল মিডফিল্ডারের জন্য এই পরিসংখ্যান তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এতে শুধু তাঁর গোল করার ক্ষমতাই নয়, আক্রমণের শেষ ধাপে কার্যকর হওয়ার সামর্থ্যও ফুটে ওঠে।
পাজের মতো খেলোয়াড়ের মূল্যায়নে গোল ও অ্যাসিস্ট অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি কীভাবে গোলের সুযোগ তৈরি করেন, কোন জায়গায় বল গ্রহণ করেন এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণে কী ধরনের সমস্যা তৈরি করেন।
পাজের খেলায় এই বৈশিষ্ট্যগুলোই তাঁকে আলাদা করে। তিনি শুধু পাস দেওয়ার জন্য পাস দেন না; আক্রমণকে বিপজ্জনক জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কখনো নিজেই শট নেন, কখনো সতীর্থকে সুযোগ করে দেন। প্রতিপক্ষের মাঝমাঠ ও রক্ষণভাগের মধ্যবর্তী জায়গায় তাঁর উপস্থিতি আক্রমণের জন্য কার্যকর হতে পারে।
আর্জেন্টিনার মতো দলে, যেখানে বল দখল করে খেলা এবং আক্রমণ সাজানোর ঐতিহ্য আছে, এমন একজন খেলোয়াড়ের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই।
মেসির মতো নন পাজ, এটাই তাঁর শক্তি
মেসির উত্তরসূরি হিসেবে পাজকে আলোচনায় আনা যতটা সহজ, দুজনের মধ্যে তুলনা করতে গেলেই ততটা সতর্ক হতে হয়। তাঁদের খেলার ধরন, শারীরিক গঠন এবং মাঠে প্রভাব বিস্তারের পদ্ধতিতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
মেসির বাঁ পা, ড্রিবলিং, ছোট জায়গায় বল নিয়ন্ত্রণ, একাধিক প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে ওঠা এবং মুহূর্তের মধ্যে গোলের সুযোগ তৈরি করার ক্ষমতা ফুটবল ইতিহাসেরই বিশেষ এক অধ্যায়। তাঁকে অনুকরণ করার চেষ্টা করে অনেক খেলোয়াড়ই নিজের স্বাভাবিক খেলার ধরন হারিয়ে ফেলতে পারেন।
পাজের মধ্যেও সৃজনশীলতা আছে, বাঁ পায়ের ব্যবহার আছে, আক্রমণাত্মক মানসিকতা আছে। কিন্তু তাঁর শক্তির জায়গা আলাদা। শারীরিক উপস্থিতি, বলের দখল ধরে রাখার সক্ষমতা এবং মাঝমাঠে দুই দিকেই অবদান রাখার সম্ভাবনা তাঁকে ভিন্ন ধরনের খেলোয়াড় করে তুলতে পারে।
সুতরাং, পাজকে দিয়ে মেসির মতো প্রতিটি আক্রমণ পরিচালনা করানোর চেষ্টা না করে তাঁর নিজস্ব গুণগুলোকে কাজে লাগানোই হবে বেশি কার্যকর পথ।
একজন খেলোয়াড়কে কিংবদন্তির মতো হতে হবে—এমন প্রত্যাশা যেমন অবাস্তব, তেমনি নতুন খেলোয়াড়কে নিজের মতো করে বেড়ে ওঠার সুযোগ না দেওয়াও দলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। পাজকে ঘিরে আর্জেন্টিনার পরিকল্পনা হওয়া উচিত তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী, মেসির অতীতের প্রতিচ্ছবি হিসেবে নয়।
রক্ষণেও বাড়তি সুবিধা দিতে পারেন পাজ
পাজকে ঘিরে আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর রক্ষণাত্মক অবদান। মেসি দীর্ঘদিন ধরে আর্জেন্টিনার আক্রমণের প্রধান দায়িত্ব পালন করেছেন। বল দখলে না থাকলে তাঁর শক্তি ও শক্তি সঞ্চয়ের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে দলকে ভারসাম্য তৈরি করতে হয়েছে।
পাজের ক্ষেত্রে চিত্রটি কিছুটা আলাদা হতে পারে। তিনি প্রতিপক্ষকে চাপ দিতে পারেন, বল হারানোর পর ফিরে এসে রক্ষণে সাহায্য করতে পারেন এবং ট্যাকল করার মাধ্যমেও দলের কাজে লাগতে পারেন। ফলে মাঝমাঠে তাঁকে ব্যবহার করলে আর্জেন্টিনা সৃজনশীলতার পাশাপাশি রক্ষণাত্মক ভারসাম্যও পেতে পারে।
আধুনিক ফুটবলে আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডারের কাছ থেকে শুধু নিখুঁত পাস কিংবা গোলের সুযোগ তৈরির প্রত্যাশা করা হয় না। প্রতিপক্ষের বিল্ডআপে চাপ দেওয়া, বল পুনরুদ্ধার করা এবং দলকে দ্রুত আক্রমণে ফেরানোর কাজও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পাজ যদি ধারাবাহিকভাবে এই দায়িত্বগুলো পালন করতে পারেন, তাহলে স্কালোনির কৌশলগত বিকল্প বাড়বে। বিশেষ করে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে মাঝমাঠে জায়গা নিয়ন্ত্রণ এবং বল হারানোর পর দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর মতো খেলোয়াড় কার্যকর হতে পারেন।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—রক্ষণে বেশি কাজ করতে পারা মানেই যে তিনি মেসির চেয়ে ভালো বিকল্প, তা নয়। বরং দুই খেলোয়াড়ের গুণ আলাদা। আর্জেন্টিনার কাজ হবে এই পার্থক্যকে কাজে লাগিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দল তৈরি করা।
ম্যাক অ্যালিস্টার ও মাস্তানতুয়োনোর সঙ্গে লড়াই
আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ আক্রমণভাগের আলোচনায় পাজ একা নন। আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনোর নামও উঠে আসছে। তবে তিনজনের ভূমিকা ও বৈশিষ্ট্য এক নয়।
ম্যাক অ্যালিস্টার মাঝমাঠে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ, বলের দখল ধরে রাখা এবং আক্রমণ ও রক্ষণের মধ্যে সংযোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তাঁর মতো খেলোয়াড় দলকে কাঠামোগত ভারসাম্য দেন। অন্যদিকে মাস্তানতুয়োনোকে ঘিরে আগ্রহের জায়গা তাঁর সৃজনশীলতা ও আক্রমণাত্মক সম্ভাবনা।
পাজের বিশেষত্ব হলো, তিনি সৃষ্টিশীলতার পাশাপাশি গোল করার সামর্থ্যও দেখিয়েছেন। ক্লাব ও জাতীয় দল—দুই জায়গাতেই তাঁর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স তাঁকে এমন একজন খেলোয়াড় হিসেবে সামনে এনেছে, যিনি আক্রমণের শেষ তৃতীয়াংশে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারেন।
তবে এই তিনজনের মধ্যে কে মেসির ১০ নম্বর জার্সি পাবেন, তা শুধু বর্তমান ফর্ম দিয়ে নির্ধারিত হওয়ার কথা নয়। স্কালোনি কোন কৌশলে দল সাজাতে চান, মাঝমাঠে কাদের সঙ্গে কাকে খেলাতে চান এবং আক্রমণের দায়িত্ব কীভাবে ভাগ করতে চান—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
আর ১০ নম্বর জার্সি পেলেই যে একজন খেলোয়াড়কে মেসির মতো সব দায়িত্ব নিতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। আর্জেন্টিনা চাইলে সৃষ্টিশীলতার দায়িত্ব একাধিক খেলোয়াড়ের মধ্যে ভাগ করে দিতে পারে। বরং মেসির অনুপস্থিতিতে এটাই হতে পারে দলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
১০ নম্বর জার্সির চেয়ে বড় দায়িত্ব নিজের পরিচয় তৈরি করা
আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি শুধু একটি নম্বর নয়। দিয়েগো ম্যারাডোনা থেকে লিওনেল মেসি—এই জার্সির সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের ফুটবল ইতিহাস, আবেগ এবং প্রত্যাশার বিশাল বোঝা।
তাই পাজের নাম উঠলেই তাঁকে মেসির উত্তরসূরি বলে ঘোষণা করার প্রবণতা স্বাভাবিক হলেও, সেটি তাঁর জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। ২২ বছর বয়সী একজন খেলোয়াড়ের সামনে এখনো দীর্ঘ পথ পড়ে আছে। নিয়মিত পারফরম্যান্স, বড় ম্যাচে নিজেকে প্রমাণ করা, চোট এড়িয়ে ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এবং জাতীয় দলের কৌশলে নিজের জায়গা প্রতিষ্ঠা করা—এসবই তাঁর পরবর্তী পরীক্ষার অংশ।
মেসির মতো হতে হবে—এই প্রত্যাশা পাজের অগ্রগতিকে সাহায্য করবে না। বরং তাঁকে এমন একজন খেলোয়াড় হয়ে উঠতে হবে, যাঁর উপস্থিতিতে আর্জেন্টিনা নতুনভাবে আক্রমণ সাজাতে পারে। তিনি হয়তো মেসির মতো ড্রিবল করে পাঁচজনকে কাটিয়ে গোল করবেন না। কিন্তু সঠিক সময়ে পাস দিয়ে, শট নিয়ে, মাঝমাঠে চাপ তৈরি করে কিংবা বল পুনরুদ্ধার করে ম্যাচে প্রভাব রাখতে পারেন।
ফুটবলে উত্তরসূরি মানেই পূর্বসূরির অনুরূপ সংস্করণ নয়। কখনো একজনের বিদায়ে যে জায়গা তৈরি হয়, পরের প্রজন্ম সেই জায়গাটিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রেও সেটাই হওয়া উচিত।
মেসির পরের আর্জেন্টিনা কেমন হবে?
মেসিকে ছাড়া আর্জেন্টিনার প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে তাঁর ব্যক্তিগত অবদানগুলোকে সম্মিলিত শক্তিতে রূপান্তর করা। এত দিন কঠিন মুহূর্তে মেসির দিকে তাকানোর অভ্যাস ছিল দলের। তিনি বল পেলে আক্রমণের নতুন পথ তৈরি হতে পারত; ম্যাচের গতি বদলে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও ছিল তাঁর।
এখন সেই দায়িত্ব এককভাবে একজনের কাঁধে তুলে দেওয়ার বদলে দলকে নতুন ভারসাম্য খুঁজতে হবে। পাজ সেই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারেন। তাঁর সৃজনশীলতা, গোল করার ক্ষমতা এবং রক্ষণে কাজ করার সামর্থ্য তাঁকে আকর্ষণীয় বিকল্প করে তুলেছে।
তবে তাঁকে নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে কয়েকটি ভালো ম্যাচের পর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসে ধারাবাহিকতায়। প্রতিপক্ষ যখন তাঁকে আরও ভালোভাবে বিশ্লেষণ করবে, জায়গা কমিয়ে দেবে এবং বল পাওয়ার সুযোগ সীমিত করবে, তখন পাজ কীভাবে নিজের প্রভাব ধরে রাখেন—সেটাই হবে আসল বিচার।
আর্জেন্টিনার জন্য আশার জায়গা হলো, মেসির বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিভার ভান্ডার ফুরিয়ে যায়নি। বরং নতুন খেলোয়াড়দের সামনে নিজেদের প্রমাণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাজের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স সেই সম্ভাবনারই ইঙ্গিত দেয়।
শেষ পর্যন্ত নিকো পাজ মেসির ১০ নম্বর জার্সি পরবেন কি না, সেটি সময়ই বলে দেবে। কিন্তু তাঁর ভবিষ্যৎ মূল্যায়নের সবচেয়ে সঠিক মানদণ্ড হওয়া উচিত তিনি কতটা মেসির মতো, তা নয়; বরং তিনি আর্জেন্টিনাকে কতটা নিজের মতো করে সাহায্য করতে পারেন।
মেসির শূন্যতা পূরণ করা হয়তো অসম্ভব। কিন্তু তাঁর বিদায়ের পর নতুন এক আর্জেন্টিনা গড়ে তোলা অসম্ভব নয়। সেই নতুন অধ্যায়ে নিকো পাজ কতটা বড় ভূমিকা রাখবেন, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।

