ক্ষমা চেয়েও পার পাচ্ছেন না লিসান্দ্রো

অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের কাছে চ্যাম্পিয়নস লিগে হারের পর ক্লাবের নীতিনির্ধারকদের সমালোচনা করে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। কোচ মাইকেল ক্যারিকের হাতে যথেষ্ট শক্তিশালী দল তুলে দেওয়া হয়নি বলে মন্তব্য করেছিলেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার। ঘটনার জেরে ক্লাবের সঙ্গে বৈঠকের পর ক্ষমা চেয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে তাঁকে জরিমানাও করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অন্দরমহলে অস্বস্তি কাটাতে এবার উদ্যোগী হলেন লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। ক্লাবের নীতিনির্ধারকদের প্রকাশ্যে সমালোচনা করে যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন, তার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন আর্জেন্টাইন এই ডিফেন্ডার। বৃহস্পতিবার ক্লাবের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন তিনি। তবে বিতর্কের জেরে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে জরিমানা করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
মঙ্গলবার চ্যাম্পিয়নস লিগে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের কাছে হারের পর ইউনাইটেডের দল গঠন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন মার্তিনেজ। তাঁর অভিযোগ ছিল, কোচ মাইকেল ক্যারিককে যথেষ্ট শক্তিশালী দল দেওয়া হয়নি। দলকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলতে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছিলেন তিনি। বিশেষ করে ক্লাবের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর জেসন উইলকক্সের কাছ থেকে আরও কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করেছিলেন ২৮ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার।
তবে নিজের মন্তব্যের ধরন ও সময় নিয়ে পরে অনুশোচনা হয়েছে মার্তিনেজের। বৃহস্পতিবার ক্লাবের নেতৃত্ব ও কোচের সঙ্গে আলোচনার পর তিনি বলেন, ‘আজ আমি ক্লাবের নেতৃত্ব ও ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করেছি। আমাদের মধ্যে খুব ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। মঙ্গলবারের ম্যাচের পর যা ঘটেছে, তা নিয়ে আমরা নিজেদের মতামত বিনিময় করেছি এবং খোলামেলাভাবে কথা বলেছি।’
নিজের আবেগপ্রবণ স্বভাবের কথাও স্বীকার করেছেন মার্তিনেজ। তিনি বলেন, ‘সবাই জানে, আমি ভীষণ আবেগপ্রবণ একজন মানুষ। ফুটবলকে আমি অত্যন্ত তীব্রভাবে অনুভব করি। হারের হতাশা থেকেই নিজের অনুভূতির কথা বলেছিলাম। কিন্তু হয়তো সেটা প্রকাশ করার সময় ও জায়গা ঠিক ছিল না। এ জন্য আমি ক্ষমা চাইছি।’
অর্থাৎ, দলের পারফরম্যান্স ও শক্তিমত্তা নিয়ে নিজের হতাশা থাকলেও সেটি প্রকাশের পদ্ধতি নিয়ে ভুল স্বীকার করেছেন মার্তিনেজ। ক্লাবের অভ্যন্তরীণ আলোচনা বাইরে চলে আসায় সৃষ্ট পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হিসেবেই দেখা হচ্ছে তাঁর এই বিবৃতিকে।
‘রাগ ও হতাশা থেকে কথাগুলো বলেছিলাম’
অ্যাটলেটিকোর কাছে হারের পর মার্তিনেজের মন্তব্য ঘিরে ইউনাইটেডের সাবেক অধিনায়ক রয় কিনও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। দ্য ওভারল্যাপ পডকাস্টে সাবেক এই মিডফিল্ডার নিজের পুরোনো ক্লাবের পরিস্থিতিকে ‘একটা সার্কাসের মতো’ বলে বর্ণনা করেছেন।
এর আগে নিজের মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মার্তিনেজ বলেছিলেন, ‘রাগ ও হতাশা থেকে’ তিনি কথাগুলো বলেছেন। একই সঙ্গে সতীর্থ, কোচ এবং ক্লাবের উন্নতির জন্য কাজ করা সবার প্রতি তাঁর আস্থার কথাও জানিয়েছিলেন।
বৃহস্পতিবারের বিবৃতিতেও ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছেন আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকলেই আমাদের ক্লাব সবচেয়ে ভালো অবস্থায় থাকে। আমি বুঝতে পারছি, ওই মুহূর্তে আমার বলা কথাগুলো সেই ঐক্য ধরে রাখতে সাহায্য করেনি।’
এরপর তিনি যোগ করেন, ‘ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের প্রত্যেকেই আমাদের অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন, তা আমি জানি। এই ক্লাব ও সমর্থকেরা যে সাফল্যের যোগ্য, সেটাই আমরা এনে দিতে চাই। এখন এই পরিস্থিতি পেছনে ফেলে আমরা সবাই একসঙ্গে জয়ের জন্য পুরোপুরি মনোযোগী।’
লিডসের বিপক্ষে খেলবেন মার্তিনেজ?
মার্তিনেজের ক্ষমা চাওয়ার পর বিতর্কের তাৎক্ষণিক অধ্যায়টি শেষ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু মাঠে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন এখনো রয়েছে। রোববার লিডস ইউনাইটেডের বিপক্ষে অ্যাওয়ে ম্যাচে তাঁকে একাদশে রাখা হবে কি না, সেটি নিশ্চিত নয়।
এই ম্যাচের আগে শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে কথা বলবেন কোচ মাইকেল ক্যারিক। দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স এবং মার্তিনেজকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি—দুটিই সংবাদ সম্মেলনে আলোচনায় আসতে পারে।
প্রিমিয়ার লিগে ইউনাইটেডের অবস্থাও স্বস্তিদায়ক নয়। চলতি মৌসুমে নয়টি ম্যাচের মধ্যে মাত্র দুটিতে জিতেছে দলটি। ছয় ম্যাচে ছয় পয়েন্ট নিয়ে লিগ টেবিলের ১৩ নম্বরে রয়েছে তারা। এমন পরিস্থিতিতে অ্যাটলেটিকোর কাছে হার এবং এরপর খেলোয়াড়ের প্রকাশ্য সমালোচনা ক্লাবের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে।
তবে মার্তিনেজকে একাদশে রাখা হবে কি না, তার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের প্রশ্নটিও আলাদা করে বিবেচনা করতে হবে। ক্লাবের সঙ্গে তাঁর বর্তমান চুক্তির মেয়াদ এ মৌসুমের শেষ পর্যন্ত। চুক্তিতে আরও এক বছর মেয়াদ বাড়ানোর বিকল্প রয়েছে ইউনাইটেডের হাতে। কিন্তু সেই বিকল্প কার্যকর করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি ক্লাব।
অর্থাৎ, সাম্প্রতিক মন্তব্যের বিতর্ক আপাতত মিটলেও ওল্ড ট্রাফোর্ডে মার্তিনেজের ভবিষ্যৎ এখনো নিশ্চিত নয়। তাঁর চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ক্লাবের ওপরই নির্ভর করছে।
সংকটটা কি শুধু মার্তিনেজের?
মার্তিনেজের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি ইউনাইটেডের চলমান সংকটের একটি দিক সামনে এনেছে। দল প্রত্যাশামতো পারফর্ম না করলে খেলোয়াড়, কোচ ও ক্লাব পরিচালকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই অসন্তোষ প্রকাশ্যে চলে এলে প্রশ্ন ওঠে ক্লাবের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও নেতৃত্ব নিয়েও।
মার্তিনেজের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল দলের শক্তিমত্তা এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ। ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে তিনি মন্তব্য প্রকাশের ধরন নিয়ে নিজের ভুল স্বীকার করেছেন, কিন্তু দল গঠন নিয়ে তাঁর উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর সমাধান হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ইউনাইটেডের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ মাঠের ফলাফলে উন্নতি আনা। লিডসের বিপক্ষে ম্যাচটি সেই অর্থে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ক্লাবকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, মার্তিনেজকে নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী হবে। তাঁকে একাদশে রাখা, চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো কিংবা দীর্ঘমেয়াদি দল গঠনে তাঁর ভূমিকা—সবকিছুই এখন পর্যবেক্ষণে।
একটি বিষয় অবশ্য পরিষ্কার, ইউনাইটেডের সমস্যার সমাধান শুধু একজন খেলোয়াড়ের ক্ষমা চাওয়ায় হবে না। মাঠের পারফরম্যান্স, দল গঠনের পরিকল্পনা এবং ক্লাবের অভ্যন্তরীণ ঐক্য—সব ক্ষেত্রেই উন্নতি আনতে হবে। মার্তিনেজের মন্তব্যে তৈরি হওয়া বিতর্ক আপাতত থামলেও ইউনাইটেডের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে।

