সাফ ফুটবল কী টিকবে?
আবারও সাফে ভারতের দ্বিতীয় দল!

নভেম্বরে ঢাকায় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে শিরোপা ধরে রাখার অভিযানে ভারতের মূল দলের বদলে অনূর্ধ্ব-২৩ বা রিজার্ভ খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া দল পাঠানোর সম্ভাবনা জানিয়েছে দেশটির সংবাদ মাধ্যম। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন কোচ খালিদ জামিল। ভারতের এমন সিদ্ধান্তে প্রশ্নের মুখে পড়ছে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ফুটবল টুর্নামেন্টের ভবিষ্যৎ।
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগটা নতুন নয়। দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্বের এই প্রতিযোগিতা একসময় ছিল মর্যাদার লড়াই, প্রতিবেশী দেশগুলোর ফুটবল-দ্বৈরথের মঞ্চ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই টুর্নামেন্টের গুরুত্ব কি কমছে? ভারতের দ্বিতীয় সারির দল পাঠানোর সম্ভাবনা সেই প্রশ্নটিকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী নভেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে শিরোপা ধরে রাখার অভিযানে ভারতের মূল দলের বদলে অনূর্ধ্ব-২৩ বা রিজার্ভ খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া দল পাঠানোর কথা ভাবছে দেশটির ফুটবল কর্তৃপক্ষ। একই সময়ে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ খেলতে সিনিয়র দল পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
দ্য ডেইলি স্টারও ২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সূচির সংঘাতের কারণেই এমন সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ চলবে ৪ থেকে ১৭ নভেম্বর। অন্যদিকে, ৭ নভেম্বর শুরু হবে ফিফার আন্তর্জাতিক বিরতি। ফলে দুটি প্রতিযোগিতার মধ্যে কোনটিকে অগ্রাধিকার দেবে ভারত, সেই প্রশ্নই এখন সামনে।
ভারতীয় কোচ খালিদ জামিলের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দুটি। ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলা দলের বিপক্ষে মাঠে নামার সুযোগকে জাতীয় দলের উন্নতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন তিনি। টাইমস অব ইন্ডিয়াকে জামিল বলেছেন, ‘ফিফা বিশ্বকাপে খেলা দলগুলোর বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের প্রস্তাব যখন দেওয়া হয়েছিল, তখন আমি ফেডারেশনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হয়েছিলাম।’
জাতীয় দলের উন্নতির জন্য শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলার গুরুত্ব নিয়ে বিতর্কের সুযোগ কম। আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে ভারতের এমন ম্যাচ বেছে নেওয়ার যুক্তিও আছে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের মূল্য যদি দিতে হয় দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক টুর্নামেন্টকে, তাহলে সাফের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
ভারতের কাছে সাফ কি শুধুই দ্বিতীয় পছন্দ?
ভারত দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে সবচেয়ে সফল দল। বর্তমান চ্যাম্পিয়নও তারা। এবারের আসরে গ্রুপ পর্বে তাদের প্রতিপক্ষ মালদ্বীপ ও পাকিস্তান। অন্য গ্রুপে স্বাগতিক বাংলাদেশের সঙ্গে আছে শ্রীলঙ্কা ও ভুটান। এমন একটি প্রতিযোগিতায় শিরোপাধারী দল যদি মূল খেলোয়াড়দের বিশ্রাম দিয়ে দ্বিতীয় সারির দল পাঠায়, তাহলে টুর্নামেন্টের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মান ও বাণিজ্যিক আকর্ষণ—দুটিই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
এখানে বিষয়টি শুধু ভারতের দল নির্বাচন নয়। সাফের মতো আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার মর্যাদা নির্ভর করে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর কাছে এর গুরুত্ব কতটা, তার ওপরও। প্রতিটি দেশ যদি নিজেদের আন্তর্জাতিক সূচিতে সাফকে অন্য প্রতিযোগিতার ফাঁকে পাওয়া একটি সুযোগ হিসেবে দেখে, তাহলে ধীরে ধীরে টুর্নামেন্টটি তার মূল উদ্দেশ্য হারাতে পারে।
বিশেষ করে ভারতের অংশগ্রহণ সাফের প্রতিযোগিতামূলক ও বাণিজ্যিক আকর্ষণে বড় ভূমিকা রাখে। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ কিংবা বাংলাদেশ-ভারত লড়াই শুধু মাঠের ফলাফলের জন্য নয়, দর্শক আগ্রহের কারণেও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভারতের মূল দল অনুপস্থিত থাকলে সেই আকর্ষণ কতটা অটুট থাকবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
অবশ্য অনূর্ধ্ব-২৩ বা রিজার্ভ দল পাঠানোর সম্ভাবনা মানেই ভারত প্রতিযোগিতাটিকে একেবারে গুরুত্ব দিচ্ছে না—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক হবে না। তরুণদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেওয়ার সুযোগ হিসেবেও সাফকে কাজে লাগাতে পারে তারা। তবে সেই ব্যাখ্যা তখনই অর্থবহ হবে, যখন দলটি প্রতিযোগিতায় যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে অংশ নেবে এবং শিরোপা ধরে রাখার বাস্তব চেষ্টা করবে।
ঐতিহ্য আছে, কিন্তু গুরুত্ব কি কমছে?
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ফুটবলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করা। বিশ্ব ফুটবলের বড় মঞ্চে নিয়মিত জায়গা করে নিতে না পারা দেশগুলোর জন্য এই টুর্নামেন্ট ছিল নিজেদের সামর্থ্য যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। জাতীয় দলের সমর্থকদের জন্যও এটি ছিল আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই।
কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলের ব্যস্ত সূচি, ক্লাবের সঙ্গে খেলোয়াড় ছাড়ার সমন্বয় এবং ফিফা উইন্ডোর বাইরে ম্যাচ আয়োজনের সীমাবদ্ধতা সাফের জন্য দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। এবারও সূচির সংঘাত সামনে এসেছে। ৪ নভেম্বর টুর্নামেন্ট শুরু হলেও ফিফার আন্তর্জাতিক বিরতি শুরু হবে ৭ নভেম্বর। অর্থাৎ প্রতিযোগিতার প্রথম কয়েক দিনে জাতীয় দলগুলোর খেলোয়াড় পাওয়া নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এই পরিস্থিতিতে সাফ কর্তৃপক্ষের সামনে বড় প্রশ্ন—কীভাবে টুর্নামেন্টটিকে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা যায়? শুধু নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিযোগিতা আয়োজন করাই যথেষ্ট নয়। জাতীয় দলগুলোর পূর্ণ শক্তির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক সূচির সঙ্গে সমন্বয় করা এবং প্রতিযোগিতাটির বাণিজ্যিক ও ক্রীড়ামূল্য বাড়ানোও জরুরি।
ভারত যদি শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় সারির দল পাঠায়, তাহলে তা সাফের জন্য একটি সতর্কসংকেত হবে। কারণ, একটি ঐতিহ্যবাহী টুর্নামেন্টের মর্যাদা শুধু তার ইতিহাস দিয়ে টিকে থাকে না; বর্তমান সময়ের দলগুলো সেটিকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য সুযোগ, সাফের জন্য শঙ্কা
ভারতের মূল দল না এলে বাংলাদেশের সামনে প্রতিযোগিতায় ভালো করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রতিপক্ষের দুর্বল দল পাওয়ার সম্ভাবনাকে বাংলাদেশের প্রধান আলোচ্য বানানো উচিত হবে না। নিজেদের মাঠে খেলা, সমর্থকদের প্রত্যাশা এবং দীর্ঘদিন পর আঞ্চলিক শিরোপা জয়ের স্বপ্ন—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জন্য এবারের সাফ গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা নিশ্চয়ই চাইবেন, ভারতসহ প্রতিটি দেশ তাদের সেরা দল নিয়ে খেলুক। কারণ, পূর্ণ শক্তির প্রতিপক্ষকে হারিয়ে শিরোপা জয়ের আনন্দ আর দ্বিতীয় সারির দলকে হারিয়ে ট্রফি জেতার অভিজ্ঞতা এক নয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা যত শক্তিশালী হবে, শিরোপার মর্যাদাও তত বাড়বে।
সবচেয়ে বড় কথা, সাফের প্রয়োজন অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সম্মিলিত অঙ্গীকার। ভারত একা নয়, প্রতিটি দেশেরই এই প্রতিযোগিতাকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। একই সঙ্গে সাফ কর্তৃপক্ষকেও এমন কাঠামো তৈরি করতে হবে, যাতে সদস্য দেশগুলোর কাছে টুর্নামেন্টটি আন্তর্জাতিক ফুটবল সূচির অবহেলিত একটি আয়োজন হয়ে না থাকে।
ভারত শেষ পর্যন্ত কোন দল পাঠাবে, তা এখনো চূড়ান্ত নয়। আপাতত বিষয়টি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও সম্ভাবনার পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাই একটি পুরোনো প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে—সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ কি এখনো দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে কাঙ্ক্ষিত মর্যাদা ধরে রাখতে পারছে, নাকি ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাচ্ছে?
এবারের আসর সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আরেকটি সুযোগ। তবে উত্তরটা শুধু মাঠের ফলাফলে পাওয়া যাবে না; পাওয়া যাবে দেশগুলো এই টুর্নামেন্টকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে দল পাঠায়, তার মধ্যেও।
